Ticker

6/recent/ticker-posts

Hedonic Treadmill: সুখের পেছনে মানুষের অন্তহীন দৌড়

 মানুষের জীবনে সুখ একটি অদ্ভুত অনুভূতি। আমরা প্রায় সবাই মনে করি—“এই জিনিসটা যদি পেতাম, তাহলে সত্যিই সুখী হতাম।” কারও কাছে সেটা হতে পারে ভালো চাকরি, কারও কাছে বেশি টাকা, নতুন ফোন, গাড়ি, নিজের বাড়ি, ভালোবাসার মানুষ কিংবা সামাজিক সম্মান। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, বহু অপেক্ষার পর সেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি পাওয়ার পর প্রথমে প্রচণ্ড আনন্দ হলেও কিছুদিন বা কিছু মাস পর সেটিই আবার স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে যায়। তখন নতুন কোনো আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়—“এবার যদি এর চেয়েও ভালো কিছু পেতাম!” সুখের এই ওঠানামা এবং অর্জনের সঙ্গে মানুষের দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার প্রবণতাকেই মনোবিজ্ঞানে Hedonic Treadmill বা Hedonic Adaptation বলা হয়।

ধরা যাক, একজন তরুণের মাসিক আয় ২০ হাজার টাকা। সে মনে করে, তার আয় যদি ৫০ হাজার টাকা হতো, তাহলে জীবনের অনেক সমস্যা দূর হয়ে যেত এবং সে অনেক সুখী হতো। কয়েক বছর পর তার আয় সত্যিই ৫০ হাজার টাকা হলো। শুরুতে তার আনন্দের সীমা থাকে না। সে ভালো পোশাক কেনে, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরে, ভালো খাবার খায় এবং নিজের জীবনকে আগের তুলনায় অনেক উন্নত মনে করে। কিন্তু কিছুদিন পর ৫০ হাজার টাকার জীবনযাত্রাই তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়। আগে যে জিনিসগুলো বিলাসিতা মনে হতো, সেগুলো এখন প্রয়োজনীয় মনে হতে থাকে। এরপর তার মনে হয়—“আয় যদি ১ লাখ টাকা হতো, তাহলে আরও ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারতাম।” এভাবেই সে এক লক্ষ্য থেকে আরেক লক্ষ্যের দিকে ছুটতে থাকে।

একই বিষয় নতুন মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। কেউ অনেকদিন ধরে একটি পুরোনো ফোন ব্যবহার করার পর নতুন একটি দামি স্মার্টফোন কিনল। ফোনটি হাতে পাওয়ার দিন তার আনন্দ অনেক বেশি থাকবে। সে বারবার ফোনটি দেখবে, নতুন ফিচার ব্যবহার করবে এবং বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করবে। কিন্তু কয়েক মাস পর সেই একই ফোন আর বিশেষ আনন্দের কারণ থাকবে না। ফোনটি তখন তার দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারণ বস্তু হয়ে যাবে। এরপর নতুন কোনো মডেল বাজারে এলে তার মনে হতে পারে, “আমার ফোনটি তো এখন পুরোনো হয়ে গেছে।” অথচ যে ফোনটি কিছুদিন আগেও তার কাছে স্বপ্নের মতো ছিল, সেটিই এখন স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।

সম্পর্ক ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। একজন মানুষ হয়তো দীর্ঘদিন একটি ভালো চাকরির জন্য চেষ্টা করেছে। চাকরি পাওয়ার পর সে মনে করে, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু কিছুদিন পর কাজের চাপ, নিয়মিত দায়িত্ব ও দৈনন্দিন রুটিনের কারণে সেই চাকরির আনন্দ অনেকটাই কমে যেতে পারে। আবার পদোন্নতি হলে কিছুদিন আনন্দ বাড়ে, কিন্তু পরবর্তীতে নতুন পদটিও স্বাভাবিক হয়ে যায়। অর্থাৎ অর্জন আমাদের সুখ বাড়াতে পারে, কিন্তু সেই সুখের প্রভাব সবসময় একই মাত্রায় থাকে না।

Hedonic Treadmill-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—মানুষের প্রত্যাশা অনেক সময় তার অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যায়। আমরা যখন একটি লক্ষ্য অর্জন করি, তখন কিছু সময়ের জন্য আমাদের সুখ বাড়ে। কিন্তু পরে সেই অর্জনকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করি এবং নতুন কোনো লক্ষ্যকে সুখের শর্ত হিসেবে দেখতে শুরু করি। ফলে মানুষ কখনো কখনো এমন একটি দৌড়ে আটকে যায় যার কোনো শেষ নেই। বেশি টাকা → আরও ভালো জীবন → আরও বেশি টাকা → আরও বড় বাড়ি → আরও বেশি সামাজিক মর্যাদা—এভাবে আকাঙ্ক্ষার তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হতে থাকে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে টাকা, সাফল্য বা নতুন কিছু অর্জন কোনোভাবেই সুখ দেয় না। এগুলো অবশ্যই জীবনের সন্তুষ্টি ও নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে মৌলিক প্রয়োজন, আর্থিক নিরাপত্তা ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে অর্থের ভূমিকা অনেক বড়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন আমরা ধরে নিই যে “আরও কিছু অর্জন করলেই আমি স্থায়ীভাবে সুখী হয়ে যাব।” কারণ মানুষ নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

এই ধারণাটি আমাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়—সুখকে শুধু ভবিষ্যতের কোনো একটি অর্জনের সঙ্গে বেঁধে রাখা উচিত নয়। “চাকরিটা পেলেই সুখী হব”, “বেতনটা বাড়লেই সুখী হব”, “বাড়ি কিনলেই সুখী হব”, “আরও ভালো ফোন কিনলেই সুখী হব”—এভাবে জীবন কাটালে হয়তো কাঙ্ক্ষিত জিনিস পাওয়া যাবে, কিন্তু সুখের সন্ধান শেষ হবে না। বরং বর্তমান জীবনের ছোট ছোট ভালো বিষয়গুলোকে মূল্য দেওয়া, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা, নিজের দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের উন্নতি করা এবং জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত Hedonic Treadmill আমাদের শেখায় যে মানুষের সমস্যা শুধু “কম পাওয়া” নয়; অনেক সময় সমস্যা হলো পেয়ে যাওয়ার পর সেটিকে খুব দ্রুত স্বাভাবিক ধরে নেওয়া। যে জীবন একসময় আমাদের স্বপ্ন ছিল, কয়েক বছর পর সেটিই আমাদের কাছে সাধারণ মনে হতে পারে। তাই জীবনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা অবশ্যই থাকবে, কিন্তু সেই দৌড়ের পাশাপাশি থেমে নিজের বর্তমান জীবনটাকেও দেখতে হবে। কারণ সুখ সবসময় সামনে থাকা পরবর্তী অর্জনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে না—অনেক সময় আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, তার মূল্য বুঝতে শেখার মধ্যেও সুখের বড় একটি অংশ নিহিত থাকে।


Poweredby jakaria 

Poweredby-jakaria 

Poweredbyjakaria 

#poweredbyjakaria 

Post a Comment

0 Comments